ইতিহাসে প্রথমবার এক্সোপ্ল্যানেট থেকে রেডিও সংকেত শনাক্ত! জেনে নিন এর পেছনের আসল রহস্য

first-exoplanet-radio-signal-beta-pictoris-b

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে যুক্ত হলো এক অভূতপূর্ব অধ্যায়। মানুষের দীর্ঘদিনের কৌতুহল ও প্রচেষ্টাকে সফল করে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহ (Exoplanet) থেকে সরাসরি রেডিও সংকেত বা রেডিও তরঙ্গ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি বিশাল গ্যাস জায়ান্ট গ্রহ থেকে এই সংকেতটি এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশবিজ্ঞানীরা ভিনগ্রহের কোনো উৎস থেকে এমন সংকেতের অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার অত্যাধুনিক 'মিরক্যাট' (MeerKAT) রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই বিরল মহাজাগতিক সিগন্যালটি ধরা পড়েছে।

কোন গ্রহ থেকে এসেছে এই রেডিও সংকেত?

জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, এই সংকেতের উৎস হলো 'বিটা পিক্টোরিস বি' (Beta Pictoris b) নামের একটি এক্সোপ্ল্যানেট।

  • এটি আমাদের চেনা বৃহস্পতি গ্রহের চেয়েও প্রায় ১০ থেকে ১২ গুণ বড় গ্যাসের তৈরি এক দানব গ্রহ।
  • গ্রহটি তার নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত দ্রুত ঘোরে এবং এর একদিনের সময়কাল মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা।
  • এই গ্রহটি যে নক্ষত্রমণ্ডলীতে অবস্থিত, সেটি আমাদের সৌরজগতের তুলনায় অত্যন্ত তরুণ (মাত্র ১ শতাংশ বয়স)।

এটি কি এলিয়েনদের পাঠানো কোনো বার্তা?

রেডিও সংকেতের কথা শুনলেই আমাদের মাথায় প্রথমে আসে ভিনগ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনদের কথা। তবে হার্ভার্ড ও ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এটি কোনো কৃত্রিম বা এলিয়েনদের পাঠানো তথ্য নয়। এটি সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক মহাজাগতিক ঘটনা।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, গ্রহটির শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে তীব্র 'রেডিও অরোরা' (Auroral Radio Emission) তৈরি হচ্ছে। ঠিক যেভাবে আমাদের পৃথিবীতে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে মেরুজ্যোতি বা অরোরা দেখা যায়, ঠিক তেমনি বিটা পিক্টোরিস বি গ্রহের বায়ুমণ্ডলে চার্জিত কণার সঙ্গে চৌম্বকক্ষেত্রের সংঘর্ষে এই তীব্র রেডিও তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছে।

আগের আবিষ্কারগুলোর সাথে এর পার্থক্য কী?

এর আগেও ২০২৩ সালে 'ওয়াইজেড সেটি' (YZ Ceti) নক্ষত্রমণ্ডলীসহ বেশ কিছু দূরবর্তী স্থান থেকে রেডিও সিগন্যাল পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই বিজ্ঞানীদের মনে সংশয় ছিল যে, সংকেতটি গ্রহ থেকে আসছে নাকি তার পাশের নক্ষত্র থেকে।

কিন্তু এবারই ইতিহাসে প্রথমবার ফিক্সড কসমিক মার্কার (কোয়াসার) ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই সংকেতটি কোনো নক্ষত্র নয়, বরং সরাসরি 'বিটা পিক্টোরিস বি' গ্রহটি থেকেই নির্গত হচ্ছে।

বিজ্ঞানীদের জন্য এই আবিষ্কার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই আবিষ্কারকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যতম 'Holy Grail' বা শ্রেষ্ঠ অর্জন বলা হচ্ছে। কারণ:

  1. এর মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি সরাসরি পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে।
  2. হিসাব করে দেখা গেছে, এই গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চেয়ে কয়েক হাজার গুণ শক্তিশালী (কমপক্ষে ১,২৫০ গাউস)।
  3. যেকোনো গ্রহে প্রাণের বিকাশ ও বায়ুমণ্ডল টিকে থাকার জন্য চৌম্বকক্ষেত্র বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার থাকা আবশ্যিক। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে মহাবিশ্বে মানুষের বসবাসের উপযোগী বা 'দ্বিতীয় পৃথিবী'র সন্ধান পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে।

যদিও বিটা পিক্টোরিস বি গ্রহটির চরম তাপমাত্রা ও বৈরি আবহাওয়ার কারণে সেখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়, তবে এই সফল অনুসন্ধান বিশ্বজুড়ে রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।


সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ইতিহাসে প্রথম কোন এক্সোপ্ল্যানেট থেকে রেডিও সংকেত পাওয়া গেছে?

উত্তর: ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি রেডিও সংকেত শনাক্ত করা হয়েছে 'বিটা পিক্টোরিস বি' (Beta Pictoris b) নামক একটি এক্সোপ্ল্যানেট বা সৌরজগতের বাইরের গ্রহ থেকে। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি বিশাল গ্যাস জায়ান্ট গ্রহ।

প্রশ্ন ২: এই মহাজাগতিক রেডিও সংকেতটি কি এলিয়েনদের পাঠানো?

উত্তর: না, বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন যে এটি কোনো এলিয়েন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাঠানো বার্তা নয়। গ্রহটির অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে সেখানে প্রাকৃতিকভাবে তীব্র 'রেডিও অরোরা' (Auroral Radio Emission) তৈরি হচ্ছে, যা থেকে এই বেতার তরঙ্গ নির্গত হচ্ছে।

প্রশ্ন ৩: কোন টেলিস্কোপের সাহায্যে এই সংকেতটি ধরা পড়েছে?

উত্তর: দক্ষিণ আফ্রিকার অত্যাধুনিক 'মিরক্যাট' (MeerKAT) রেডিও টেলিস্কোপ অ্যারে ব্যবহার করে এই ঐতিহাসিক সংকেতটি সফলভাবে রেকর্ড করা হয়।

প্রশ্ন ৪: জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কী?

উত্তর: এটিই প্রথম আবিষ্কার যেখানে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের প্রভাব এড়িয়ে শতভাগ নিশ্চিত হয়েছেন যে সংকেতটি সরাসরি গ্রহ থেকেই আসছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি সরাসরি পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের বসবাসের উপযোগী অন্য গ্রহ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে。

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url